সোমবার, ১১ই জুন, ২০১৮

‘কাজের মেয়ে’দের ছাড়া অচল আমরা

নিউজ টাইম কলকাতা ডট কম
জানুয়ারি ১১, ২০১৬
news-image

শ্রাবণী মিত্র মজুমদার।

আমাদের পরিবারগুলো যাদের কাঁধে ভর দিয়ে দিনের পর দিন ছুটে চলেছে এই ওয়াই-ফাই যুগেও, চলুন আজ না হয় একটু তাদের কথাই বলি। নিশ্চই ভাবছেন নিজেদের পরিবারের কোন সদস্যদের কথাই বলছি। না, যাদের কথা বলছি তারা নামমাত্র মজুরির বিনিময়ে দিনের পর দিন আমাদের ছোট ছোট পরিবারগুলোকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। যারা ছাড়া এই ব্যস্ততার যুগে চলা অসম্ভব। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন আমি সেইসব মানুষগুলোর কথাই বলছি যারা আমাদের বাড়ির পরিচারিকা হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন।

ব্যাঙ্গালোরের বাসিন্দা পুষ্প অচন্তা তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের কিছু অভিজ্ঞতার কথা আমাদের সাথে ভাগ করে নিয়েছেন। দীর্ঘদিন তিনি কাজ করেছেন সামাজিক এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে ‍পিছিয়ে পড়া মহিলাদের নিয়ে। বিশেষ করে গার্হস্থ্য কাজে টাকার বিনিময়ে যারা সাহায্য করে পরিবারগুলোকে, অর্থাৎ যাদের আমরা পরিচারিকা বা চলতি ভাষায় ‘কাজের লোক’ বলে থাকি। শহরের উচ্চবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত পরিবারগুলিকে কাজে সাহায্যের জন্য বড় ভূমিকা থাকে এদের। পুষ্প অচন্তা জানাচ্ছেন, তার এক প্রাক্তন সহকর্মী একদিন কর্মক্ষেত্রে এসে অকারণে মেজাজ হারাচ্ছিল তার কারণ তার বাড়ির কাজের মেয়ে জয়াম্মা একদিন ছুটি নিয়েছে এবং সেই সহকর্মীর কথা অনুযা‌য়ী একদিনেই সবকিছু অগোছালো হয়ে গেছে। এটাই বাস্তব, পরিচারিকাদের একদিনের ছুটিতেই দৈনন্দিন জীবনে ছুটে চলা জেট প্লেনটি হঠাৎ তার গতি হারায়, সুতরাং তাদের গুরুত্ব যে অপরিসীম তা আর বলার অপেক্ষা রা‍‌খে না। অথচ দিনের পর দিন তারা অসম্মানের সাথে কাজ করে চলেন নিরন্তর। ২০০৪-০৫ সালে জাতীয় নমুনা সমীক্ষায় দেখা গেছে ভারতে গার্হস্থ্য শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৪৭লক্ষ, যারা প্রতিদিন তাদের সময়, শক্তি, পরিশ্রম সবকিছু ব্যয় করছে অন্য কোনো পরিবারের জন্য। ঘর মোছা থেকে শুরু করে বাচ্চাকে স্কুলে দিয়ে আসা, আবার কখনও বা বয়স্ক মানুষের দেখাশোনা করা ইত্যাদি। তাদের নিজেদের পরিবার থেকে যাচ্ছে অন্ধকারে। মনিবের বাড়ির বাচ্চা‍‌টি যখন জল খাবারের টেবি‍‌লে পাচ্ছে দুধ-‍‌ডিম বা ফলের রস সেখানে নিজের বাচ্চাটি হয় তো ফ্যানা ভাত খেয়েই দিন কাটাচ্ছে। নিজেদের বাচ্চাদের দিকে ঠিকভাবে খেয়াল না রাখতে পারার জন্য, বাচ্চারা ছোটবেলা থেকেই জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধমূলক কাজে। যতোটা কাজের কথা বলে পরিচারিকাদের নিযুক্ত করা হয়, দেখা যাচ্ছে তার থেকে অনেক বেশি কাজ অনেক সময় করতে হচ্ছে। একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা গীতা মেনন জানিয়েছেন, পরিবারের বড় কোনো দুর্ঘটনায় বিশেষ করে চুরি ডাকাতির মতো ঘটনায় সবার প্রথমে এদের দিকেই আঙুল তোলা হয়। অনেক ক্ষেত্রে হয়তো সত্যি এরা অপরাধী হয় কিন্তু সব ক্ষেত্রে তা হয় না। তাছাড়া সবার প্রথমে তদন্ত না করেই কেন এদের দিকে আঙুল তোলা হয়। গীতা মেনন জানিয়েছেন যে তারা এদের নিরাপত্তা, মর্যাদা, সঠিক মজুরি ইত্যাদির জন্য লড়ে যাচ্ছেন।

ঝাড়খণ্ড, আসাম, বিহার এইসব জায়গা থেকে কম বয়সের আদিবাসী মহিলাদের ভালো চাকরির বা অনেক সময় খাওয়া থাকার লোভ দেখিয়ে অনেক দূরে নিয়ে যাওয়া হয়, তারপর তাদের উপর শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার করা হয়, দিনের পর দিন। সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে তাদের দিয়ে সব কাজ করানো হয়। একজন আদিবাসী মহিলা তার উপরে যে সব অত্যাচার হয়েছে, লুকিয়ে তার ভিডিও করে ঝাড়খণ্ডের আদিবাসী ফোরামে দেখিয়েছেন, কোন একটা গ্রাম থেকে নিয়ে গিয়ে এদের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে কাজে নিযুক্ত করা হয়, যাতে তারা একে অপরের সাথে যোগাযোগ করতে না পারে। এমনকি কোন সমস্যায় যাতে পরিবারের সাথেও যোগাযোগ না করতে পারে তার ব্যবস্থাও করা হয়। কিছুদিন আগে ঝাড়খণ্ডের পাহাড়িয়া আদিবাসী কমিউ‍‌নিটির ১৭ বছরের একটি মেয়েকে জোর করে গুরগাঁওয়ে নিয়ে যাওয়া হয় বাড়ির পরিচারিকার কাজের জন্য। তারপর নানা অত্যাচার। অবশেষে পুলিশ এবং চাইল্ডলাইন ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশনের সাহায্যে তার নিজের ‍পরিবারের কাছে ফিরে আসতে পারে। আসামের উষা থেনেনা যাকে প্রতিদিন সহ্য করতে হয় অনেক অত্যাচার, শেষ পর্যন্ত ডোমেস্টিক ওয়ার্কার্স রাইটস ইউনিয়নের সাহায্যে সে তার বাড়িতে ফিরে যায়। এই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাটির সাথে এখন ৪০০০ সদস্য যুক্ত আছে। এইরকম অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলো সমাজের অবহেলিত, মহিলাদের নিয়ে কাজ করছে, এগিয়ে যাচ্ছে তাদের নানান সমস্যায়। তবে সব ঘটনার শেষেই যে আলো দেখা যায় এমনটা নয়, চেন্নাই, মু্ম্বাই, হায়দরাবাদের মতো শহরে এরকম প্রচুর ঘটনা ঘটছে, যেখানে প্রতিদিন হারিয়ে যাচ্ছে কোন না কোনো পরিবারের সন্তান। পরিবারে ফিরে আসা তো দূরের কথা, তারা হারিয়ে যাচ্ছে চিরতরে।

স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলো জানাচ্ছে যে চিন্তার বিষয় হলো দিন যতো যাচ্ছে শিশু-শ্রমিকের সংখ্যা ততো বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলো যখন তাদের পড়াশোনা করানোর জন্য আরজি নিয়ে যাচ্ছে, তখন দেখা যাচ্ছে আরো বেশি সময় ধরে তাদের কাজে ‍‌নিযুক্ত রাখা হচ্ছে আর বলা হচ্ছে যে পড়াশোনার জন্য তাদের হাতে সময় নেই।

পরিচারিকাদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলি যে দাবিগুলি তুলেছে তার মধ্যে রয়েছে – আট ঘণ্টা কাজের জন্য মাসে ন্যূনতম ৮০০০ টাকা দিতে হবে। সপ্তাহে একদিন ছুটি দিতে হবে। সন্তানসম্ভবা মহিলাদের মাঝে মাঝে ছুটি দিতে হবে। পড়াশোনা করার সুযোগ দিতে হবে। কাজের জায়গায় যাতে নিরাপত্তা থাকে, সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। মনিব য‍‌দি সরকারি কর্মচারী হয় এবং পরিচারিকা যদি বাড়িতে চিরস্থায়ী ভাবে থাকে তাহলে তার চিকিৎসার ভার তাকে নিতে হবে। পূর্ণ সময়ের জন্য যাদের নিয়োগ করা হবে এবং তারা যদি উচ্চ প্রশিক্ষণ পেয়ে থাকেন, তবে অবশ্যই তাদের বেতন হবে ন্যূনতম ৯০০০ টাকা।

ভারত সরকারও এখন পরিচারিকাদের রাষ্ট্র স্বাস্থ্য বিমা যোজনার আওতায় আনার কথা জানিয়েছে। ন্যাশনাল স্কিম ডেভলপমেন্ট কর্পোরেশনের সাহায্যেও এদের এখন প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তবে সব থেকে যেটা জরুরি বিষয়, তা হলো যাদের জন্য এগুলো করা হচ্ছে সবার প্রথমে তাদেরকে এই বিষয়গুলি জানতে হবে, তবে এটাও ঠিক যে আমরা যারা এদেরকে নিয়োগ করছি, সঠিক লোককে নির্বাচন করছি কিনা সেদিকে যথেষ্ট খেয়াল রাখতে হবে এবং পাশাপাশি সহানুভূতিশীলও হতে হবে।