মঙ্গলবার, ১২ই জুন, ২০১৮

তালিবান হানায় রক্তাক্ত পাক বিশ্ববিদ্যালয়, হত ২৫

নিউজ টাইম কলকাতা ডট কম
জানুয়ারি ২০, ২০১৬
news-image

পেশোয়ার: ভয়াবহ জঙ্গি হানা পাকিস্তানে। একাধিক পড়ুয়ার রক্তে ভেসে গেল শিক্ষারমন্দির। পড়ুয়াদের দাঁড় করিয়ে মাথায় গুলি করল জঙ্গিরা। শিক্ষার্থীদের রক্তেই ভিজল শিক্ষাঙ্গনের মাটি। ঘটনাস্থল উত্তর-পশ্চিম পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের চারসাদ্দা শহরের বাচা খান বিশ্ববিদ্যালয়। হামলায় অন্তত ২৫ জন মারা গিয়েছে। নিহতদের মধ্যে বেশিরভাগই পড়ুয়া। তালিকায় রয়েছেন শিক্ষাঙ্গৃনের এক অধ্যাপকও। যদিও, বেসরকারি সূত্রে, নিহতের সংখ্যা অনেক বেশি।

বুধবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজির ছিলেন হাজার তিনেক পড়ুয়া। বিশেষ আলোচনাসভা উপলক্ষ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রায় ছ’শো অতিথি। শুরুটা হয়েছিল সুষ্ঠভাবেই। কিন্তু, কয়েক মিনিটের মধ্যেই গুলির শব্দে ছন্দপতন ঘটে। পড়ুয়ারা তখনও ব্যাপারটা আঁচ করতে পারেননি। কিন্তু, ঘোর কাটার আগেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ব্লক থেকে ভেসে আসতে শুরু করে গুলিবৃষ্টি ও বিস্ফোরণের শব্দ।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, বুধবার সকালে কুয়াশা ছিল অন্যান্য দিনের তুলনায় একটু বেশিই। সেই কুয়াশার চাদরের আড়াল নিয়েই বয়েজ হস্টেলের পিছন দিয়ে ক্যাম্পাসে ঢোকে জঙ্গিরা। জঙ্গি হামলার খবর ততক্ষণে ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়েছে। ক্লাস থেকে বেরনোর জন্য শুরু হয়ে গিয়েছে হুড়োহুড়ি। কিন্তু, সবাই বেরিয়ে আসার আগেই সেখানে পৌঁছে যায় সশস্ত্র জঙ্গিরা। ক্লাসরুমে ছাত্রদের লক্ষ্য করে নির্বিচারে শুরু হয় গুলিবৃষ্টি। এখানে ওখানে ছিটকে পড়ে গুলিবিদ্ধ ছাত্রদের নিথর দেহ। রক্তে ভেসে যায় ক্লাসরুমের মেঝে।

কিছুক্ষণের মধ্যে ক্যাম্পাসে পৌঁছয় পুলিশ। তারপর সেনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর আকাশে চক্কর কাটতে শুরু করে সেনার হেলিকপ্টার। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে তখন উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের ভিড়। কেউই তখন বুঝতে পারছেন না ভিতরে কী হচ্ছে। এক অভিভাবক বলেন, যতবার গুলির শব্দ কানে আসছে, মনে হচ্ছে নিজের সন্তানকে আর জীবিত দেখতে পাব তো! ডন নিউজ সূত্রে খবর, সেনার পৌঁছনোর খবর পেয়েই জঙ্গিরা আরও নৃশংস রূপ ধারণ করে।

খবরে প্রকাশ, প্রথমে শোনা গিয়েছিল, ৬০-৭০ জন পড়ুয়াকে দাঁড় করিয়ে তাদের মাথায় গুলি করে দেয় জঙ্গিরা। তবে, এই তত্ত্ব নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। এরপর জঙ্গিদের লক্ষ্য করে পাল্টা গুলিবৃষ্টি শুরু করে সেনা। প্রথমে দুই জঙ্গির মৃত্যু হলেও, বাকিরা অন্য ব্লকে গা ঢাকা দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যে বাকি জঙ্গিদের দু’টি ব্লকের মধ্যে ঘিরে ফেলে সেনা। বাইরে কয়েকটি বাড়ির ছাদ থেকে নিশানা তাক করে তৈরি হয়ে যায় স্নাইপাররা। সেনার পাল্টা আক্রমণের মুখে ক্রমশ পিছু হঠতে শুরু করে জঙ্গিরা। কিছুক্ষণের মধ্যে মৃত্যু হয় ক্যাম্পাসে থাকা আরও দুই জঙ্গির। সেনার অনুমান, আরও কয়েকজন জঙ্গি সেখানে ছিল। তবে তারা আক্রমণের মুখে পালিয়েছে। এই হামলার দায় স্বীকার করেছে জঙ্গি সংগঠন তেহরিক ই তালিবান।

জঙ্গি হামলার ঘটনার তীব্র নিন্দা করলেন পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ। পাক প্রধানমন্ত্রী এক বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, যারা নিরীহ ছাত্র ও সাধারণ মানুষকে গুলি করে হত্যা করে, তাদের কোনও ধর্ম হয় না, কোনও দেশ নেই তাদের। পাকিস্তানের আত্মত্যাগ বিফলে যাবে না, মন্তব্য পাক প্রধানমন্ত্রীর। হামলার তীব্র নিন্দা করা হয়েছে ভারতের তরফেও। প্রসঙ্গত, ২০১২ সালে আব্দুল গফ্ফর খানের স্মৃতিতে তাঁর নামেই তৈরি হয় পেশোয়ারের বাচা খান বিশ্ববিদ্যালয়। উদ্দেশ্য ছিল, পাকিস্তানে উচ্চশিক্ষার প্রসার ও মানোন্নয়ন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ার সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিনহাজার।

বাচা খান বিশ্ববিদ্যালয়ে বুধবার জঙ্গি হামলার ঘটনাক্রম–
সকাল ৯
প্রতিদিনের মতো বুধবারও ক্লাস শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু, কয়েক মিনিট পরেই হঠাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতর থেকে ভেসে আসে গুলির শব্দ।

সকাল ৯.৩০
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বয়েজ হস্টেলের দিকে পরপর তিনটি বিস্ফোরণ ঘটে। ততক্ষণে ক্লাসে ক্লাসে ছুটোছুটি পড়ে গিয়েছে।

সকাল ১০
পড়ুয়াদের দাবি, জঙ্গি হামলার প্রায় আধ ঘণ্টা পর বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছোয় পুলিশ। ততক্ষণে বিশ্ববিদ্যালয়ে জঙ্গিদের হত্যালীলা শুরু হয়ে গিয়েছে।

সকাল ১০.৩০
ক্লাসে ক্লাসে ঢুকে এলোপাথাড়ি গুলি চালাতে শুরু করে জঙ্গিরা। ক্লাসঘরে লুটিয়ে পড়ে পড়ুয়াদের রক্তাক্ত দেহ।

সকাল ১১
ততক্ষণে কোনওমতে বাইরে বেরিয়ে আসতে পেরেছেন কয়েকজন পড়ুয়া। তাদের মুখেই খবর মেলে, জঙ্গিদের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন সৈয়দ হামিদ হুসেন নামে এক রসায়নের শিক্ষক।

সকাল ১১.১৫
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতর থেকে আরও চারটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।

সকাল ১১.৩০
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ব্লকে ছড়িয়ে পড়ে জঙ্গিরা। চারদিক থেকে তখন ভেসে আসছে আতঙ্কিত পড়ুয়াদের চিৎকার, আর তাকে ছাপিয়ে গুলির শব্দ।

সকাল ১১.৩৫
সেনার গুলিতে মৃত্যু হয় দুই জঙ্গির।

সকাল ১১.৪৫
দ্য ডন নিউজ সূত্রে খবর মেলে, ৭০ জন পড়ুয়াকে দাঁড় করিয়ে মাথায় গুলি করে জঙ্গিরা।

সকাল ১১.৫০
বাকি জঙ্গিদের দু’টি ব্লকের মধ্যে ঘিরে ফেলে সেনা।

বেলা ১২
সেনার গুলিতে শেষ আরও দুই জঙ্গি।

দুপুর ১
পাক সেনার তরফে জানানো হল, ক্যাম্পাসে থাকা সমস্ত জঙ্গির মৃত্যু হয়েছে। তবে সেই সঙ্গে প্রাণ হারিয়েছে অসংখ্য শিক্ষক, পড়ুয়া ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মীও।