বুধবার, ১৩ই জুলাই, ২০১৬

ভারতে শেক্সপিয়র

নিউজ টাইম কলকাতা ডট কম
ফেব্রুয়ারি ১, ২০১৬
news-image

নীলাঞ্জন হাজরা

র‌্যাল্ফ ফিচ প্রথম ইংরেজ যিনি ভারতের আঁখো দেখা হাল লেখেন৷ সে লেখা প্রকাশ করে হ্যাকলুয়িট৷ ১৫৮৮ সালে৷ পুনম ত্রিবেদী এ বইয়ের ভূমিকায় জানিয়েছেন সেই ইস্তক বিল শেক্সপিয়রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক৷ কারণ এই ফিচ সাহেবই আলেপ্পোর পথে ‘টাইগার’ নামক জলযানে চড়ে ত্রিপোলি পাড়ি দিয়েছিলেন, আর পণ্ডিতরা প্রায় নিশ্চিত সে যাত্রার কথাই বলা আছে ম্যাকবেথ নাটকে৷ সে সম্পর্ক গভীরতর হয় সপ্তদশ শতকের গোড়া থেকে৷ পুনমের মন্তব্য, সারা দুনিয়াই শেক্সপিয়রের মঞ্চ৷ দেখা যাচ্ছে শুধু স্থলে নয়, জলেও৷ ১৬০৭ সালের সেপ্টেম্বরে সিয়েরা লিয়োন বন্দরে নোঙর ফেলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জাহাজ ‘ড্রাগন’৷ সেই জাহাজেই ৫ এবং ৩০ সেপ্টেম্বর অভিনীত হয় হ্যামলেট আর দ্বিতীয় রিচার্ড নাটক দু’টি৷ এরপর অষ্টাদশ শতকে ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের মনোরঞ্জনের জন্য ভারতীয় উপকূলবর্তী নানা শহরে নিয়মিত অভিনীত হতে থাকেন শেক্সপিয়র৷ ১৭৭৫ সালে কলকাতায় এবং ১৭৭৬ সালে বম্বেতে তেমন অভিনয়ের অকাট্য প্রমাণ আছে৷ ১৭৭৫ সালে তো কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় দ্য ক্যালক্যাটা থিয়েটার৷ মূল হোতা ছিলেন ডেভিড গ্যারিক৷ ১৭৭৫ থেকে ১৮০৮ সালের মধ্যে শেক্সপিয়রের অন্তত আটটি নাটক মঞ্চস্থ হয় এখানে৷ আর শেক্সপিয়রের নাটক নিয়মিত দেখা যেত দ্বারকানাথ ঠাকুরের সাহায্যে ১৮১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘চৌরঙ্গি থিয়েটার’-এ৷ ১৮৩৫ সালে যখন এই থিয়েটার নিদারুণ অর্থকষ্টে পড়ে, ৩০১০০ টাকা খরচে সেটি সরাসরি কিনেই নেন দ্বারকানাথ৷ এই করেই করেই এ দেশীয় নাট্যসাহিত্যের অন্দরমহলে ঢুকে পড়েছিলেন শেক্সপিয়র৷ তবেই না সেই টালমাটাল ১৮৫৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ‘দ্য হিন্দু পেট্রিয়ট’ পত্রিকার মন্তব্য, ‘… Some of the best plays of Shakespeare were acted upon the stage by young Hindoos who appeared to enter into the spirit of the characters they personated.’

এই যে শেক্সপিয়রের সঙ্গে ভারতের দুশো বছরেরও বেশি সম্পর্ক, তাই পুনম ত্রিবেদী এবং ডেনিস বার্থোলোমেউস সম্পাদিত এই বইয়ের আলোচ্য বিষয়৷ বইটির তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে – ‘ট্রান্সলেশন’, ‘ইন্টারপ্রিটেশন’ এবং ‘পারফরম্যান্স’৷ প্রতিটি বিভাগেই রয়েছে বিশেষজ্ঞদের বিভিন্ন প্রবন্ধ৷ ‘ট্রান্সলেশন’ বিভাগ শুরু হয়েছে শিশিরকুমার দাশের প্রবন্ধ ‘শেক্সপিয়র ইন ইন্ডিয়ান ল্যাঙ্গোয়েজেস’ দিয়ে৷ এই বিভাগে রয়েছে হরিশ ত্রিবেদী, জাভেদ মালিক এবং বিজয়া গুট্টলের প্রবন্ধও৷ ভারতীয় নাট্যকারেরা কী ভবে শেক্সপিয়রকে আত্মীকৃত করছিলেন তার উদাহরণ দিতে গিয়ে দেখিয়েছেন ১৮৭০ সালের মুম্বইয়ের পার্সি থিয়েটার ধারার প্রথম উর্দু নাটক এদুলজি খোরির ‘খুরশিদ’-এর সঙ্গে ‘সিমবেলাইন’-এর বিভিন্ন অংশের আশ্চর্য মিল!

‘ইন্টারপ্রিটেশন’ বিভাগে রয়েছে তিনটি প্রবন্ধ৷ লিখেছেন আর এ মালাগি, আর ডব্লিউ দেশাই এবং সুকান্ত চৌধুরী৷ বইটির দীর্ঘতম বিভাগ ‘পারফরম্যান্স’৷ রয়েছে আটটি প্রবন্ধ৷ শুধু মঞ্চেই নয়, হিন্দি সিনেমাতেই কী ভাবে ছায়া ফেলেছেন শেক্সপিয়র তা নিয়ে আলোচনা করেছেন রাজীব বর্মা৷

পুনম এবং ডেনিস সমস্ত সম্ভাব্য দিক থেকে পাঠকের সামনে হাজির করেছেন শেক্সপিয়র-ভারত সম্পর্কের হরেক আনাচ কানাচ৷ আর তা করতে গিয়ে এ বইয়ের প্রবন্ধকারেরা দেখিয়েছেন এক সংস্কৃতি থেকে সম্পূর্ণ অন্য এক সংস্কৃতিতে চালান হওয়ার সময় কিন্ত্ত মুছে যায় না শেক্সপিয়রের বুনিয়াদি অস্তিত্ব৷ বরং এই সাংস্কৃতিক আমদানি থেকে যা বেরিয়ে আসে, তা লক্ষ্মী চন্দ্রশেখরের ভাষায়, ‘something rich and strange’৷