বুধবার, ১৩ই জুলাই, ২০১৬

হিন্দু সম্পত্তি দখল করে মসজিদ নির্মাণ: ঢাকায় হিন্দু-মুসলমান বিরোধ

নিউজ টাইম কলকাতা ডট কম
জুন ২৬, ২০১৬
news-image

দেশত্যাগী হিন্দু সম্পত্তি বা অর্পিত সম্পত্তি দখল করে রাজধানী ঢাকার গেণ্ডারিয়ার  একটি মসজিদ নির্মাণ করা নিয়ে  হিন্দু-মুসলমানে তুমুল বিরোধ চলছে। স্থানীয় কিছু মুসলমান এখানে মসজিদ নির্মাণ করেছেন। অন্যদিকে  স্থানীয় হিন্দুরা দাবি করেছেন, এখানে মন্দির ছিল, জমিটি একজন হিন্দু ব্যক্তির অর্পিত সম্পত্তি।

জানা যায়, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে গেণ্ডারিয়ার কালী চরণ সাহা এলাকার ৩১ নম্বর হোল্ডিং-এর ৩৮৪ অযুতাংশ সম্পত্তির মালিক ছিল রাধারানী দাস। একাত্তরের পর এটি অর্পিত সম্পত্তিতে পরিণত হয়, যেখানে এখন মুসলমানরা দখল করে মসজিদ নির্মাণ করছে- এমন অভিযোগ হিন্দুদের। এজন্য গত শুক্রবার গেণ্ডারিয়া থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) দায়ের করেন হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ গেণ্ডারিয়া থানা শাখার সাধারণ সম্পাদক পরিতোষ কুমার রায়। রোববার সকালে এটি নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

রোববার দুপুর দেড়টার দিকে ওয়ারী জোনের পুলিশের ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) নুরূল ইসলামের নেতৃত্বে একদল পুলিশ সেখানে যায়। জায়গাটি নিয়ে যেহেতু আইনি ঝামেলা চলমান সেহেতু মসজিদে উপস্থিত মুসল্লি ও মসজিদ নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত কর্তাদের পুলিশ জানিয়ে দেয়, মসজিদ নির্মাণ বন্ধ রাখতে। এক পর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে মুসল্লিদের বাকবিতণ্ডা শুরু হলে ‘মিল ব্যারাক সমাজ কল্যাণ সংগঠনের’ সাধারণ সম্পাদক শরীফকে আটক করতে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। যদিও শরীফকে পুলিশ আটক করতে পারেনি।

পুলিশ চলে যাবার পর সরেজমিনে দেখা গেছে, তুমুল উত্তেজনাকর অবস্থা। মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেয়া হয়, “হিন্দুরা পুলিশ দিয়ে মসজিদ ভেঙে দেয়ার ষড়যন্ত্র করেছে। পুলিশ অস্ত্র ঠেকিয়ে মসজিদ থেকে মুসল্লিদের বের করে দিয়েছে। এলাকাবাসী এসে যেন মসজিদে অবস্থান নেয়। যে কোনো মূল্যে এই জায়গা হিন্দুদের দখলে যেতে দেয়া হবে না।” মসজিদের মাইকে এই ঘোষণার পরপরই শতাধিক নারী-পুরুষ কিছু লাঠিসোঠা সহ মসজিদে সমবেত হয়ে পুলিশ ও হিন্দু বিরোধী ‘উত্তেজক’ কথা বলতে শুরু করে। এক পর্যায়ে সামনের রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়।

দেশত্যাগী ওই সম্পত্তিতে নির্মাণাধীন মসজিদের নাম দেয়া হয়েছে ‘কাপড়িয়া নগর জামে মসজিদ’। শাহ মোহাম্মদ রাজিব ও ফজলুল করিম রাজন নামের দুইজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, দুই মাস আগে এখানে মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। গত শুক্রবার এখানে জুমার নামাজ আদায়ের মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো নামাজ আদায় করা হয় এবং সেই থেকে এখনও নিয়মিত নামাজ আদায় করা হচ্ছে। অন্য সূত্র মতে, নতুন মসজিদে প্রথমবার নামাজ পড়ে মসজিদ উদ্বোধনের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল স্থানীয় সাংসদ (সরকারের শরিক জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচিত) কাজী ফিরোজ রশীদকে। কিন্তু জায়গাটি বিরোধপূর্ণ জানানো হলে সাংসদ ফিরোজ রশিদ সেখানে যাননি।

এলাকার হিন্দুদের গেণ্ডারিয়া থানায় দায়ের করা জিডিতে বলা হয়েছে- এলাকার কতিপয় লোক রাধারানী দাস্যার মালিকানাধীন অর্পিত সম্পত্তির তালিকাভুক্ত ভূমিতে মসজিদ নির্মাণের অপপ্রয়াস চলাচ্ছে। ফলে এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। মসজিদ নির্মাণ হলে সনাতন ধর্মীয় জনসাধারণের ক্ষতির কারণ ঘটবে। নাম না প্রকাশের শর্তে এলাকার একজন হিন্দু নেতা এই প্রতিনিধিকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে জায়গাটি অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে মর্তুজা ও শরীফ। জায়গাটিতে এক সময় মন্দির ছিল। কর্তৃত্ব বজিয়ে রাখার রাস্তা হিসেবে তারা মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

পরিতোষ কুমার রায় বলেন, সোমবার আমরা দখলকৃত জায়গাটি পুনরুদ্ধারে জেলা শাসককে স্মারকলিপি দেব।

সরেজমিনে দেখা গেছে, মসজিদের চার সীমানায় হাঁটু সমান দেয়াল তোলা হয়ে গেছে। দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছে ২/৩ দিন হয়েছে। মেঝের স্থানে বালু। এর উপর কার্পেট ও সাদা কাপড় বিছানো। বাঁশের সহায়তায় ছাউনি দেয়া হয়েছে নতুন টিন দিয়ে।

মিল ব্যারাক সমাজ কল্যাণ সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ মর্তুজা রোববার দুপুরে এই প্রতিনিধিকে জানান, জায়গাটি আমাদের সংগঠন সহ ৬জন মুসলমান ব্যক্তির মালিকানাধীন ছিল। এসব ব্যক্তিদের কাছ থেকে মসজিদ নির্মাণের কথা বলে, নামমাত্র মূল্য দিয়ে জায়গার দখল নেয়া হয়। আমাদের জায়গায় আমরা মসজিদ নির্মাণ করব, তাতে হিন্দুদের সমস্যা কী? আমরা তাদের কী ক্ষতি করছি? তিনি অভিযোগ করেন- আমরা পুলিশের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তারা আমাকে গাঁজাখোর বলে গালি দিয়েছে। অস্ত্র দেখিয়ে, কারও মাথায় ঠেকিয়ে বলেছে মসজিদ নির্মাণ করতে দেয়া হবে না, কথা না শুনলে গুলি করা হবে, শরীফকে অযথা ধরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

সংগঠনসহ অন্যরা কীভাবে জায়গাটি দখলে রেখেছিল- প্রশ্নের উত্তরে মুসলিম সম্প্রদায়ের ব্যক্তিরা জানান, ১৯৯৩ সালে জায়গাটির কিছু অংশ লিজ নেয় সংগঠনটি। বাকিদের কেউ মালিকানা সূত্রে জায়গার কিছু অংশের মালিক, কেউ লিজ সূত্রে দখল নিয়েছিল। একাত্তরের পর থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে এই জায়গা সম্পূর্ণ সরকারের দখলে ছিল। সংগঠন ছাড়া বাকি পাঁচজনের কয়েকজন হলেন- জাকির হোসেন, শিপন, ভোলা।

গেণ্ডারিয়া থানার ওসি কাজী মিজানুর রহমান এই প্রতিনিধিকে বলেন, ঘটনাটি পুলিশ খুব গুরুত্ব সহকারে দেখছে। চেষ্টা করা হচ্ছে- হিন্দু-মুসলমান উভয়ের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তির। পুলিশ সম্পর্কে মর্তুজার করা অভিযোগ নিয়ে তিনি বলেন, একজন ডিসির সামনে কোনো অশালীন কথা কী বলা যায়? হিন্দু-মুসলমানে ধর্মীয় বিষয় নিয়ে সংঘাত তৈরির জন্য এখানে কেউ কেউ যুক্ত আছে। তাদের অবশ্যই দমন করা হবে।

পুলিশের আরেকটি সূত্র জানায়, মতুর্জা বঙ্গবন্ধু শিশু একাডেমি নামের একটি ভুয়া সংগঠন পরিচালনা করছে। আগে তিনি বিএনপি করতেন।